বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৫ পূর্বাহ্ন
ফ্রান্সের হেনরি কাগান এবং জাপানের কেনসো সোয়াই। ছবি: সংগৃহীত অনলাইন ডেস্ক, একুশের কণ্ঠ:: অণুর ‘দর্পণ প্রতিবিম্ব’ রহস্যের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সের অঁরি বি. কাগাঁন (Henri B. Kagan) ও জাপানের কেনসো সোয়াই (Kensō Soai)। অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে ‘নন লিনিয়ার প্রভাব’ এবং স্ব অনুঘটন বা অটোক্যাটালাইসিস নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য তাঁদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সুইডেনের স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এ বছরের রসায়নে নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা করে।
তাঁদের গবেষণা রসায়নের এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের পুরোনো একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই রাসায়নিক অণুর দুই ‘দর্পণ প্রতিবিম্ব’ রূপের মধ্যে কীভাবে একটি রূপ স্বতন্ত্রভাবে তৈরি হতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাঁদের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অণুর এই দুই রূপকে বলা হয় ‘চিরাল’ বা হাত সদৃশ অণু। বিষয়টি অনেকটা মানুষের ডান ও বাম হাতের মতো। দুটি হাত একে অপরের দর্পণ প্রতিবিম্ব হলেও কোনোভাবেই একটির ওপর আরেকটি পুরোপুরি মেলানো যায় না।
জীবদেহে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ অণু, বিশেষ করে অ্যামিনো অ্যাসিড, চিরাল বৈশিষ্ট্য বহন করে। জীবনের রসায়নে সাধারণত এসব অণুর দুই রূপের মধ্যে একটি রূপই প্রাধান্য পায়। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ‘হোমোকাইরালিটি’।
ওষুধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব
কাগাঁ ও সোয়াইয়ের গবেষণা শুধু রসায়নের একটি মৌলিক রহস্যের সমাধানেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে ওষুধ তৈরিতেও। কোনো ওষুধের অণুর দুই দর্পণ প্রতিবিম্ব রূপের একটির কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাগত প্রভাব থাকতে পারে। অন্যটি আবার কম কার্যকর হতে পারে, এমনকি অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তৈরি করতে পারে।
এ কারণে নির্দিষ্ট একটি দর্পণ প্রতিবিম্ব অণু বেছে নিয়ে সেটি বেশি পরিমাণে তৈরি করতে পারা আধুনিক ওষুধশিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাগাঁ ও সোয়াইয়ের গবেষণা এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া নকশার পথ দেখিয়েছে, যার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত চিরাল অণু তৈরির সম্ভাবনা বাড়ানো যায়।
কাগাঁর গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি
১৯৮৬ সালে অপ্রতিসম রাসায়নিক সংশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটান অঁরি কাগাঁ। তিনি এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যার মাধ্যমে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একটি দর্পণ প্রতিবিম্ব অণু অন্যটির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পরিমাণে তৈরি করা সম্ভব হয়।
এর ফলে রসায়নবিদেরা আগে যা সম্ভব বলে মনে করতেন, তার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় নির্দিষ্ট একটি চিরাল রূপ তৈরি করতে সক্ষম হন।
পরবর্তী সময়ে অপ্রতিসম সংশ্লেষণ, বিশেষ করে ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট অণু উৎপাদনে এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
সোয়াইয়ের যুগান্তকারী গবেষণা
কাগাঁর কাজের পর আরও এক ধাপ এগিয়ে যান জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার ধারণা তুলে ধরেন, যার মাধ্যমে বিক্রিয়াকে নির্দিষ্ট একটি দর্পণ প্রতিবিম্ব রূপ তৈরির দিকে পরিচালিত করা সম্ভব হতে পারে।
এরপর ২০০৩ সালে সোয়াই এমন একটি বিক্রিয়া প্রদর্শন করেন, যেখানে সম্ভাব্য দুই দর্পণ প্রতিবিম্বের মধ্যে কার্যত একটি রূপই তৈরি হয়। নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের স্বাভাবিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার বাইরে এমন সাফল্য এর আগে অর্জিত হয়নি।
সোয়াইয়ের গবেষণায় ‘স্ব অনুঘটন’ বা অটোক্যাটালাইসিসের বিশেষ ভূমিকা সামনে আসে। সহজভাবে বললে, কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া একটি পদার্থ একই ধরনের আরও পদার্থ তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
এই প্রক্রিয়া কীভাবে একটি নির্দিষ্ট দর্পণ প্রতিবিম্ব অণুকে প্রাধান্য দিতে পারে, তা বোঝার ক্ষেত্রে সোয়াইয়ের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শত বছরের পুরোনো রহস্য
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ভাষ্য অনুযায়ী, কাগাঁ ও সোয়াইয়ের কাজ রসায়নের এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের পুরোনো একটি রহস্যের সমাধান বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। জীবনের রসায়নে কেন এবং কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ‘হাত’ বা দর্পণ প্রতিবিম্ব রূপ প্রাধান্য পায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাঁদের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নোবেল কমিটির মতে, তাঁদের আবিষ্কার ওষুধ তৈরির জন্য রাসায়নিক বিক্রিয়া নকশার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুরস্কারের অর্থমূল্য ১২ মিলিয়ন ক্রোনার
২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারের মোট অর্থমূল্য ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার। অঁরি কাগাঁ ও কেনসো সোয়াই সমানভাবে এই অর্থ ভাগ করে নেবেন। এর পাশাপাশি তাঁরা নোবেল পুরস্কারের সনদ ও মেডেল পাবেন।
আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।
রসায়নে নোবেলের ইতিহাস
১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার চালুর পর থেকে রসায়নে বহু যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবছর এ পুরস্কার দেওয়া সম্ভব হয়নি। যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে কয়েকটি বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়নি।
রসায়নে একাধিকবার নোবেল পাওয়া বিজ্ঞানীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফ্রেডেরিক স্যাঙ্গার। তিনি ১৯৫৮ ও ১৯৮০ সালে দুইবার রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান। একইভাবে কে. ব্যারি শার্পলেস ২০০১ ও ২০২২ সালে রসায়নে নোবেল পান।
অন্যদিকে, মেরি কুরি দুই ভিন্ন বিজ্ঞান বিভাগে নোবেলজয়ী হওয়ার বিরল নজির স্থাপন করেন। ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়ার পর ১৯১১ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান তিনি।
অণুর ‘দর্পণ প্রতিবিম্ব’ রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল ঘোষণা সেই দীর্ঘ ইতিহাসে যুক্ত করল নতুন এক অধ্যায়।